Bookmark and Share
Monday, 06.09.2010, 12:51pm (GMT+9) Home FAQ RSS Links Site Map Contact
 
 
 
All News  
বাংলাদেশ
জাতীয়
রাজনীতি
অন্যান্য সংবাদ
বিশেষ প্রতিবেদন
আইন ও অপরাধ
বিশেষ সংবাদ
বিশ্ব সংবাদ
জাপানের সংবাদ
জাপান টুকিটাকি
অন্য প্রবাস
বিবেক ভাবনা
জাপানের কথা
বিনোদন
তথ্য প্রযুক্তি
স্বাস্থ্যকথা
খেলার খবর
গ্রামগঞ্জ
সাক্ষাতকার
কৃতিত্ব
সাহিত্য
ঘোষণা
::| Poll
বিবেকবার্তার নতুন সাইট কেমন লাগছে?
ভাল
ভাল না
মন্তব্য নেই
 
 
 
অন্যান্য সংবাদ
 
কোড়কদী সমাবেশের ইতিবৃত্ত সন্ধানে
Tuesday, 02.03.2010, 10:12pm (GMT+9)

সুব্রত কুমার দাস, যদি বলি কোড়কদী বাংলাদেশের আটষট্টি হাজার সাধারণ গ্রামের একটি তাহলে পাঠকের স্বাভাবিক প্রশ্ন হবে সে সকল গ্রামের অনুসন্ধান নিয়ে এমন ঘটা হবে কি? যদি বলি কোড়কদী আর সব সাধারণ গ্রামের মত একটি নয়, তাহলে স্বতঃস্ফুর্ত প্রশ্ন হল এটি কি এমন কোন অসাধারণ গ্রাম যেমন বারদী  বা বিক্রমপুরের কিছু কিছু গ্রাম? কোড়কদী কি তেমন যেমন টাঙ্গাইলের সেই গ্রাম যেখানে ঘুরন্ত নাট্যশালা ছিল! তবে সত্য যে কোড়কদী সাধারণ একটি গ্রাম নয়। এর অসাধারণত্ব খুঁজে ফিরছি আমরা অনেকেই। সে খোঁজাখুঁজির একটি সা¤প্রতিক ঘটনা হলো ৩০ জানুয়ারিতে ‘কোড়কদী সমাবেশ’-এর আয়োজন যেখানে ছিলেন সে অঞ্চলের অন্তত ৪/৫ হাজার মানুষ আর সাথে ছিলেন ঢাকা ও ফরিদপুরের কয়েকশ আগ্রহী। যুক্ত হয়েছিলেন কোড়কদীর কৃতী মানুষদের ভারতবাসী উত্তরপ্রজন্মের কয়েকজনও।
 
বর্তমানের কোড়কদী
ফরিদপুর জেলার এ গ্রামটি বর্তমানে মধুখালি উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। কিছুদিন আগেও ছিল বালিয়াকান্দি উপজেলাতে। দীর্ঘকাল  ইউনিয়নের মর্যাদা থাকলেও ক্ষয়িষ্ণু  কোড়কদী এখন মেগনামা  ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী চন্দনা এখন নিকটবর্তী খালের চেয়ে ক্ষীণতনু। একটি কাঁচা রাস্তা ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের সাথে মাইল দুয়েক দূরের গ্রামটিকে যুক্ত করেছে।
 
কোড়কদীর অতীত নিয়ে এলাকার মানুষদের ভাবনা
গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিল। প্রধানত ব্রাহ্মণ। কোড়কদীর বাবুরা অনেক বড়লোক ছিলেন। এক গ্রামেই ২০/৩০ টির বেশি দুর্গা পূজা হতো। ফুটবল খেলার মাঠ ছিল অনেকগুলো। আর ছিল বিশাল বিশাল বিল্ডিং। সুরম্য সে অট্টালিকাগুলো ছিল পরস্পর লাগোয়া। একটা ভবনের ছাদে উঠলে নাকি সারা গ্রাম ঘুরে আসা যেত। নাম ছিল ‘ছোট কলকাতা’। কলকাতার সাথে ছিল প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। অনেক শিক্ষিত মানুষ ছিলেন কোড়কদীতে। যে কালে এক গ্রামে একজন বিএ/এমএ পাস করলে সারা গ্রাম ভেঙে পড়তো দেখার জন্য সেকালে কোড়কদীতে ২০/৩০ জন বিএ/এমএ পাস লোক ছিলেন। ইত্যাদি ইত্যাদি গুঞ্জনে কোড়কদীর চারপাশের গ্রামগুলোর মানুষরা শুনতেন। কাছাকাছি গ্রাম কামারখালির বাসিন্দা হওয়ায় তেমন কথা বর্তমান লেখকেরও কানে এসেছে।
চমক সৃষ্টির কাল
সত্তরের দশকের শেষদিকে কোন একবার বর্তমান লেখকের বাবা প্রয়াত বৈদ্যনাথ দাস (১৯২৬-১৯৯২) কলকাতা ভ্রমণ শেষে সাথে করে নিয়ে এলেন মহাভারত-মঞ্জরী। ফুটপাথে পাওয়া সে বইয়ের দৈন্য চেহারা এ লেখকের কিশোর মনকে আকর্ষণ করতে পারে নি। আকর্ষণ সৃষ্টি হতে হতে শতক বদলাচ্ছে। কথা সাহিত্যের অলিগলি খুঁজতে যেয়ে একদিন কলকাতার লিটল ম্যাগ পরিকথার উপন্যাস সংখ্যায় নবাঙ্কুর-এর উল্লেখ এবং এর লেখিকার বাড়ি কোড়কদী করোটিতে যেন আলোড়ন তুলেছিল। আমাদের কোড়কদীর লেখিকা! দেশভাগ, মন্বন্তর, তেভাগা নিয়ে কোড়কদীর লেখিকা! যেন এক ঘোরের ভেতর দিন যায় - খুঁজে ফিরি কোড়কদীর লেখিকার লেখা বই।
 
যাত্রা হল শুরু
নৈমন্তিক শাহবাগ আজিজ মার্কেটের বই পাড়াতে ঘোরাঘুরির এক মাহেন্দ্রক্ষণে চোখের সামনে হলুদ কভারের সুলেখা সান্যালের গল্প সংগ্রহ। উদ্বেলিত হাতে ভূমিকার পাতা উল্টাতেই পেয়ে যাই মাত্র ৩২ বছরে প্রয়াত সে-লেখিকার বোন সুজাতা সান্যালের বর্ধমানের ঠিকানা।
মাস খানেক পর ভারতের খামে চিঠি এল - পাশে প্রেরক সুজাতা সান্যাল। ক’দিন পর এলো এঁদের বড়দা অবন্তীকুমার সান্যালের পত্র। এটুকু বোঝা গেল অধ্যাপনার সাথে যুক্ত এ মানুষটি লেখালেখির সাথেও যুক্ত বটে। ফেলে যাওয়া দেশের প্রতি যেমন রয়েছে তাঁর প্রাণের আকুতি তেমনি সে দেশ নিয়ে গবেষণামূলক কাজেও তাঁর আগ্রহের কমতি নেই। কুড়িয়ে বেড়াচ্ছেন অতীত ফরিদপুর তথা মধুখালী যার সাথে যুক্ত ভূষণা নামটি।
 
প্রথম স্টেশন
২০০২ সালের মাঝামাজির দিকে আমার বন্ধু প্রবীর কুমার দাশ গেলেন কলকাতায় পারিবারিক কাজে। বাল্যবন্ধুর অনুরোধ ফেলেন নি তিনি। গিয়েছিলেন অবন্তীকুমার সান্যালের বাড়িতে। নিয়ে এলেন সুলেখা সান্যালের লেখা নবাঙ্কুর-এর ফটোকপি। সে কী আনন্দঘন দিন আমার। আমার হাতে নবাঙ্কুর। বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী - পুরুষ লেখকের হয়ে ওঠার  কথা। কোন লেখিকার হয়ে ওঠার প্রথম কথাই কি তাহলে নবাঙ্কুর হবে। কিন্তু উল্লেখ নেই কেন কোন পাঠ্য রেফারেন্স গ্রন্থে? শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় হন্যে হয়ে বিফল আমি হয়তো মনে মনে প্রতিজ্ঞাই করে ফেলেছিলাম ‘সুলেখাকে চিনিয়ে ছাড়ব’।
 

বাংলাদেশের দৈনিক
বেগম রোকেয়ার (১৮৮০-১৯৩২) পদ্মরাগ (১৯২০) শৈলবালার ঘোষজায়ার (১৮৯৪-১৯৭৪) কয়েকটি উপন্যাসে নারীর অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। অনেক পরে একই বছর ১৯৯৯ তে বেরোয় আকিমুন রহমানের (জন্ম ১৯৫৯) রক্তপুজে গেঁথে যাওয়া মাছি ও তসলিমা নাসরিনের (জন্ম ১৯৬০) আমার ছেলেবেলা। উপন্যাস হাতে আসার পূর্বেই শুধু গল্পগ্রন্থটি নিয়ে লিখে ফেললাম ‘সুলেখা সান্যাল: তাঁর গল্পের জগত’। জনকণ্ঠের সুদিনে সাহিত্য সম্পাদক নাসির আহমেদ  ২০০৩ এপ্রিলে তা প্রকাশ করায় সাহস সঞ্চিত হল অনেক। উপন্যাসের ফটোকপিটা হাতে পেতেই নাওয়া খাওয়া বন্ধ। যেন অচেনার ভেতর চেনা এক জগত। এতো কোড়কদী! মাঠঘাঠ, ধানক্ষেত, রাস্তা-নদী সবই তো আমার আত্মার আত্মীয়। প্রধান চরিত্র ছবিও তো কেমন যেন চেনাচেনা। যেন মাথায় খুন চাপল। বড় সমালোচকেরা যাই বলুক সুলেখা সান্যালকে আমি তুলবই। সামগ্রিক এ প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত সুলেখা সান্যালের উপন্যাসটি নিয়ে একটি বড়সড় আলোচনা লিখে ভীরু হাতে দিয়েছিলাম রমরমা সাহিত্য পাতার অধিকারী সংবাদ -এর সাহিত্য সম্পাদক আবুল হাসনাতকে। ২০০৪ এর ১৫ জানুয়ারি ‘বিস্মৃত নারীবাদী উপন্যাস নবাঙ্কুর’ সংবাদ সাময়িকীতে প্রকাশিত হলে ভীরুতা কেটে গেল পুরোপুরি।
 
প্রণতি তোমায় সুজাতাদি
সুলেখাকে নিয়ে আমার চিন্তনের শুরু থেকেই যে মানুষটি প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রেখেছেন তিনি তাঁর ছোট বোন সুজাতা সান্যাল। অকালপ্রয়াত দিদির প্রতি কী গভীর টান তাঁর এখনো! প্রয়োজনমত চিঠি লিখে তিনিই এ বিষয় আমাকে সব সময় উজ্জীবিত রেখেছেন। সাথে দিয়ে তাঁর কবিতার বই নতুন লেখা কবিতাও। একুশে ফেব্র“য়ারিকে নিয়ে তাঁর লেখা একটা কবিতা এখানে উৎকলন করলে কেমন হয়?
 
বাঁধন
সুজাতা সান্যাল চট্টোপাধ্যায়
 
এই বুকে গুলি কর যদি
যন্ত্রণাদীর্ণ উচ্চারণ হবে বাংলা ভাষায়
এই নদীতে ভাসাও যদি সে জল শুধু
বাংলা ভাষার গান বয়ে নিয়ে যাবে,
এই শ্মশানে দাহ কর যদি বাংলা ভাষাই
হবে আগুনের লকলকে শিখা -
আমার কবরের ওপরে শিশিরে শিশিরে
ভেজা ভাষা-জননীর পায়ের ছাপ -
লক্ষীপুজোর আল্পনা শুভ্র নরম পা
ফেলে যায় বাংলা ভাষার পাঁচালির গানে।
বাঁচি শুধু বাংলা ভাষার জন্যে - যদি মরি
বাংলা ভাষা  বুকে নিয়ে চলে যাব-
নাভিমূলে পাকে পাকে চড়ানো মায়ের
সেই আ-মরি বাংলা ভাষার বাঁধন।
 

সুজাতাদিই জানিয়েছিলেন তাঁর ছেলের বয়সী আমি। কিন্তু নির্দ্বিধ চিত্তে ভাই ডেকেছেন আমাকে। তাঁর দিদিকে নিয়ে আমার আগ্রহ তাঁকে প্রীত করেছে। সুজাতাদি, আপনি কি জানেন, আপনার এই প্রীতিকর মুগ্ধতা আমাতে কতখানি শক্তি যুগিয়েছিল!
 
অবন্তীকুমারকে পেতে পেতে
অবন্তীকুমার সান্যালের বইয়ের সংখ্যা কত? সংখ্যার কথাটাই কি এমন জোর দিয়ে বলা উচিত? কম সংখ্যক বই লিখেও কি অনেকে বড় লেখকের মর্যাদা পান নি? শুধুমাত্র প্রসঙ্গ: রম্যাঁ রলাঁ ও রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দ ও রম্যাঁ রলাঁ বই দুটোই যদি তিনি লিখতেন তাহলেও বাংলা ভাষায় রচিত ফরাসি এ দার্শনিক লেখকের পরিপ্রেক্ষিতে অবন্তীকুমার কি অবশ্য উচ্চার্য একটি নাম হয়ে উঠতেন না? অন্য সব গদ্যগ্রন্থ প্রাচীন নাট্যপ্রসঙ্গ, কবির অভিনয়, বাবু, ভারতীয় কাব্যতত্ত¡ ইত্যাদির সবগুলোই তো কত শক্তিশালী প্রয়াস, যদি বাদই রাখি তাঁর দীর্ঘ অনুবাদ গ্রন্থের তালিকা।
 
 কোড়কদীর নৃত্যশিক্ষক
সুজাতার প্রথম চিঠিতেই জেনেছিলাম তাঁদের সেজভাই হলেন অজিত সান্যাল। বাফা’র শুরুরকালে তিনি নৃত্যশিক্ষক ছিলেন। অজিতদার প্রতি আমার দূরতম শ্রদ্ধা বেড়েছে যখন একবার মাগুরা ভ্রমণকালে এক লাইব্রেরিতে পেয়ে যাই তাঁর রচিত দুই দেশ দুই মন গ্রন্থটি। আমার জানা ছিল না তিনি ইউরোপ ভ্রমণ করেছেন। সে ভ্রমণের বৃত্তান্ত দিয়ে প্রকাশ করেছেন গ্রন্থ। বাঁধভাঙ্গা বিস্ময় নিয়ে আমি উল্টাতে থাকি সে গ্রন্থ। ১৯৫৯-তে ছাপা। একই বছরে দ্বিতীয় প্রকাশ। আর রূপায়নে? কামরুল হাসান। বাংলাদেশের নৃত্যগুরু বুলবুল চৌধুরীর সাথে বৃটেন, হল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ভ্রমণ করেছেন অজিত সান্যাল ১৯৫৩ সালে।
মোহনবাগানের কৃতী ফুটবলাররাও কোড়কদীর
১৯১০ সালে কলকাতার মোহনবাগান ক্লাব ভারতীয় ফুটবলে প্রথম বারের মত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। সে সময় দলটির অধিনায়ক ছিলেন কোড়কদীর শিবদাস ভাদুড়ী। পরে একই গ্রামের বিজয়দাস ভাদুড়ীও দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন।
 
যা পারছিলাম না
খণ্ড খণ্ড এই চিত্রগুলো নিয়ে সামগ্রিকতা দিতে অসুবিধা হচ্ছিল। কিছুতেই যেন পূর্ণাঙ্গতা পাচ্ছিল না যা দিয়ে কোড়কদী নিয়ে একটি লেখা তৈরী করা সম্ভব। তেমন ভাঙাচোড়া ভাবনারাজিকে জুড়ে বসালাম ‘কোড়কদী: এ ভেরি স্পেশাল ভিলেজ’। ডেইলি স্টারের ইনসাইটে ওটাকে ছাপলেন রাফি সাহেব। আমার কাজের গতি বাড়ল। জানলাম অন্তত দুজনের জন্মস্থান ভুলভাবে কোড়কদীর মানুষদের তালিকায় আমি দিয়েছি। একজন প্রবোধকুমার সান্যাল, আর অন্যজন হলেন নকশাল আন্দোলনের নেতা কানু সান্যাল। প্রবোধ সান্যালের বাড়ি ফরিদপুর হলেও, কানুর সান্যাল এ তল্লাটেরই না।
 
২০০৯ শুরু থেকে
বছরের শুরুর দিকে লিখি ‘ইন সার্চ অব সুলেখা সান্যাল’। ডেইলি স্টারের সে সময়কার সাহিত্য সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম ৩/৪ মাস পরে হলেও ছেপে দিয়ে সুলেখা চর্চায় নতুন বাঁক সৃষ্টি করলেন যেন। ইংরেজিতে লেখা হওয়ার কারণে ইন্টারনেটে যতগুলো জায়গায় সুলেখা সান্যাল আলোচিত হয়েছেন আমার লেখাটি সেখানে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ পেয়েছে। নবাঙ্কুর এর ইংরেজি অনুবাদের অংশাবশেষসহ স্টারের সে পাতাটি চোখে ভাসে।
 
মহাভারত-মঞ্জরীর কথা
কোড়কদীর লেখক আজ থেকে পঁচাশি বছর আগে লিখেছিলেন মহাভারত নামক মহাকাব্যের নতুন গদ্যভাষ্য ও টিকা-টিপ্পনী। যাঁকেই সে গ্রন্থের কথা বলি, বিস্মিত হন। কিন্তু আমার তো প্রয়োজন সে গ্রন্থ নিয়ে একটি লেখা ছাপানোর। তেমনই এক সময়ে আহŸান এলো মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির পক্ষ থেকে দুর্গাপূজা সাময়িকী অঞ্জলির জন্য লেখা দিতে। মনে হল মহাভারত সম্পর্কিত রচনা প্রকাশের উপযুক্ত স্থান। লিখলাম ‘মহাভারত প্রসঙ্গে মহাভারত-মঞ্জরী’।
 
কোড়কদী নিয়ে কিছু একটা করা
কোড়কদীর কৃতী লেখকদের যখন চিনছি সে সময় ফেসবুকে যে মানুষের সাথে আমার যোগাযোগ ঘটে তিনি কৃষ্ণা লাহিড়ী মজুমদার। তাঁর সাথে যোগাযোগের সূত্রটি নিশ্চয়ই এমন যে আমি ফেসবুক জুড়ে তন্নতন্ন করে খুঁজছিলাম এমন কেউ আছে কিনা যার পূর্ব পুরুষ কোড়কদীর। কৃষ্ণাদি জানিয়েছিলেন তেভাগা আন্দোলনের নেতা অবনী লাহিড়ী তাঁর বাবা। পাগল প্রায় আমি দ্রুতই সংগ্রহ করি অবনী লাহিড়ীর তিরিশ চল্লিশের বাংলা। স্থির সিদ্ধান্ত নিই কোড়কদীকেই নিয়ে একটা কিছু করতেই হবে মানুষকে জানাতেই হবে সে গ্রামে দীর্ঘ  ঐতিহ্য, এর বিপুলতা, সাহিত্য ক্ষেত্রে গ্রামটির সন্তানদের সুদূর বিচরণ। কৃষ্ণাদিকে ভাবনার কথা জানাতেই ইতিবাচক উত্তর আসে। তিনি কোড়কদীর মাটিতে দাঁড়াতে চান।
 
স্বপ্ন বাস্তবায়নের আকাক্সক্ষা
কোড়কদীর নিয়ে ভাবনার কথাটি প্রথম উত্থাপন করি মাগুরা নাজির আহমেদ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ কাজী  ফিরোজের সাথে। আমার পরম শ্রদ্ধেয় এ মানুষটি সকল ভাল কাজের অংশীদার, উৎসাহদাতা। দুজনের আলাপে কোন সময় যেন আমরা ‘কোড়কদী সমাবেশ’ শব্দবন্ধ নির্দিষ্ট করি। অরাজনৈতিক একটি আবহে ঐ প্রত্যন্ত গ্রামে ইতিহাস-ঐতিহ্য আশ্রিত একটি সফল অনুষ্ঠানের স্বপ্ন দেখতে থাকি আমরা।
শুরু হয় দৌড় ঝাঁপ। অধ্যক্ষ ফিরোজ প্রধান দৌঁড়বিদ, সাথে কামারখালীর সংস্কৃতিকর্মী শিক্ষক শেখর সাহা। দৌড় শুরু হতেই পাওয়া গেল দক্ষ আরেকজন - মধুখালি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান আবু সাঈদ মিয়াকে। ক্রমে ক্রমে যুক্ত হয়ে চল্লেন আরো কতকত জন। এলাকার রাজনীতিকর্মী, সংস্কৃতিসেবক, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক পর্যন্ত এসে যুক্ত হতে থাকলেন। সবার চোখে একটিই স্বপ্ন - আর তা কোড়কদীকে ঘিরে।
বিষয়টি ক্রমে এমন বিপুলতায় রূপ নিতে থাকল যে স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার কেউ আর বাইরে থাকলেন না। এলাকার সংসদ সদস্য মোঃ আব্দুর রহমানকে প্রস্তাব পাঠাতেই তাঁর সাদর সম্মতি যেন অঞ্চলবাসীকে করে তুলল অধিকতর উত্তুঙ্গ। ঢাকাতে সকল যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে গেলাম আমি। দৌঁড়ে গেলাম ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে। বাংলাদেশে ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর ভাই চিরকালই বন্ধুসুলভ আর উদার। উদ্যোগকে স্বাগত জানাতে তাঁর তুলনা নেই। ফরিদপুর জেলার মানুষ কৃতী সাংবাদিক ও লেখক আবু সাঈদ খানের সমকাল অফিসে তাঁকে অতিথি হওয়ার একটি প্রস্তাব দিতেই প্রাপ্তি ঘটল দুটি। তিনি কোন কথা ছাড়াই অতিথি হতে রাজী হলেন। আর অনুষ্ঠানের অর্থ সংগ্রহে আমার দুর্দশা দেখে স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে আশ্বাস দিলেন বিজ্ঞাপন খুঁজে দেওয়ার। আশ্বাস পেলাম প্রবীণ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জুর কাছ থেকে। এগিয়ে এলেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, সাথে নিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানীকে। নোয়াখালিতে বসে নিয়মিত পরামর্শ ও আশ্বাস দিয়ে চলছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযু্িক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. সঞ্জয় কুমার অধিকারী। আর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এমএ আজিজ মিয়া তো নিরন্তর আমার সৎকাজের সহযাত্রী। দৌঁড়ে বাসায় এলেন কোড়কদী স্কুলের কৃতী সন্তান  ডা. মাসুদ-উল  হক মুন্সী ওরফে মুন্সী বেলাল। হাতে গুঁজে দিলেন সাধ্যানুযায়ী টাকার একটা বান্ডিল, বললেন, ‘আমরা পারিনি। তুমি উদ্যোগ নিয়েছ, এগিয়ে যাও’। বেলাল ভাইয়ের আশীর্বাদ আমাকে অনেক শক্তি যুগিয়েছিল।
 
সমাবেশের ব্রসিউর
অর্থাভাব থাকলেও অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি ব্রসিউর প্রকাশকে প্রথম থেকেই আবশ্যিক বিবেচনা করেছি। কোড়কদী সংক্রান্ত আমার লেখাগুলোকে ব্রসিউর উপযোগী করে তুলতে তুলতে কলকাতা থেকে এলো তিনটি লেখা - কোড়কদীর দুই প্রবীন দেবেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ও অজিত সান্যাল, আর লিখলেন শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ছেলে অলোক ভট্টাচার্য। কবিতা এলো সুজাতাদির কাছ থেকে। সুজাতাদির স্বামী শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় ছেলের সহযোগিতায় ইন্টারনেটে পাঠালেন পারিবারিক ছবির এ্যালবাম। ব্রসিউর ক্রমে হয়ে উঠল এক ঐতিহাসিক দলিল। লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত সুলেখার মস্কোর ছবি! ভাবা যায়! ব্রসিউরের কাজ চলাকালেই জানা গেল জে এল ভাদুড়ীর কথা, ব্যাঙ আর ব্যাঙাচি নিয়ে গবেষণা ক্ষেত্রে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আরও জানা গেল মৃদুলা ভট্টাচার্য  এ গ্রামে নারী আন্দোলন পরিচালনা করতেন। গ্রামের মেয়েরা কোদাল কেটে পুকুর করেছিলেন স্বদেশি যুগে। স্বদেশি যুগে এ গ্রামেই গান গাইতে হুলিয়া মাথায় এসেছিলেন চারণ কবি মুকুন্দ দাস। এ গ্রামের প্রেক্ষাপটে উপন্যাস লিখেছিলেন অমল সান্যাল কনক দ্বীপ নামে। পরে সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী এ গ্রামের প্রেক্ষাপটেই মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস জনমে জনমে লেখেন। এলাকার উৎসাহী সাহিত্যকর্মী আকরাম খান লিখেছেন উপন্যাস দেউল। 
 
এগিয়ে এলো সেই দিন
কোড়কদী যদি দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরতে হয় তাহলে একটাই উপায় - ঢাকাতে কোড়কদীকে উপস্থাপন করতে হবে। আর তাই আমাদের সাহিত্যিক সংগঠন বাংলাদেশ লিটারারি রিসোর্স সেন্টার (বিএলআরসি) পরিকল্পনা করে রেখেছিল সমাবেশের আগের দিন ঢাকাতে একটা প্রেস কনফারেন্স করবে। ২৯ জানুয়ারি সে কনফারেন্স হল জাতীয় প্রেস ক্লাবে। সংবাদ মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক কর্মীর উপস্থিতি সেখানে আয়োজকদের ভীষণভাবে উৎসাহিত করেছিল। বিচারপতি মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী যখন বললেন ‘আসুন আমরা দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে জানি। কোড়কদী দিয়ে শুরু হোক সে যাত্রা’ তখন উপস্থিত অনেকেই উদবেলিত বোধ  করেছিলেন। প্রেস কনফারেন্সে উপস্থিত কৃষক নেতা অবনী লাহিড়ীর কন্যা কৃষ্ণা লাহিড়ী মজুমদারের কণ্ঠ কি বেশি ভারী ঠেকেছিল সেদিন!
 
এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
ঢাকা থেকে এক বাস ভর্তি আমরা। দুটি ছোট গাড়ীও আছে বহরে। অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ড. মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেনও তরুণকর্মীদের সাথে মেতে উঠলেন হাসি-আনন্দে। পদ্মা নদী পাড় হয়ে বাস ছুটল ফরিদপুরের দিকে। খবর আসছে ফরিদপুর শহর থেকে বাস ভাড়া করে লেখক-বুদ্ধিজীবীরা চলেছেন কোড়কদীর উদ্দেশ্যে। অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছুতে পৌঁছুতে কত যে ফোন - যেন প্রাণের আকুতি। মধুখালি পাড় হয়ে বাগাটের আগেই সুসজ্জ্বিত তোরণ - কোড়কদী সমাবেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে। বাস ছেড়ে সবাইকে উঠতে হল মিনিবাসে। কাঁচা রাস্তা দিয়ে মানুষের ঢল - যেন মানুষের বান।
 
আমরা সমাবেশ স্থলে
কোড়কদী রাস বিহারী হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা রাস্তার দুপাশে ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কী বিশাল জনসমাবেশ। প্রশস্ত মাঠের চারপাশে বসেছে গ্রামীণ মেলা। অধ্যাপক আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে ফরিদপুরের সাহিত্য-সংস্কৃতিকর্মীরা স্টল দিয়েছেন। সাজিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের চিত্র, বীরশ্রেষ্ঠদের ছবি। এই বিরান প্রান্তরে এমন আয়োজনের কৃতিত্ব কার আবু সাঈদ মিয়া আর অধ্যক্ষ কাজী ফিরোজের কথা মানুষের মুখে মুখে। মাইকে অধ্যক্ষ ফিরোজের দরাজ কণ্ঠ মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছিল দশ ঘন্টার সেদিনকার সমাবেশকে।
 
সমাবেশে কি হলো
ঢাকার অতিথির প্রথাসিদ্ধ বক্ততা দিলেন। এলাকার ক’জন প্রবীণ করলেন স্মৃতিচারণ। অবনী লাহিড়ী দুই মেয়ে কৃষ্ণা আর অপলা এবং শ্যামেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ছেলে অলোক যা বললেন তাতে ভিজে উঠল উপস্থিত কয়েক সহস্র মানুষের চক্ষু। এমপি সাহেবের ভাষণ দিয়ে যখন বক্তৃতা পর্ব শেষ হচ্ছে তখন সন্ধ্যা গড়িয়েছে। কিন্তু দর্শক শ্রোতাদের যেন বিরক্তি নেই। শুরু হল সাংস্কৃতিক  পর্ব। আকরাম খান আর শ্যামল পাল পালন করলেন অগ্রণী ভূমিকা। সময় স্বল্পতা আর অন্যান্য বিবেচনার পর ঢাকার অতিথিদের বাস রওনা দিয়েছিল সন্ধ্যা লাগতেই। কলকাতা আর দিল্লীর অতিথিদের সাথে আমরা ক’জন থেকে গেলাম সহস্র গ্রামবাসীর ভীড়ে। যখন সাংস্কৃতিক পর্ব শেষ হল ঘড়ির কাটা রাত দশটা পার করছে।
 

সমাবেশের প্রাপ্তি
এলাকার বিপুল সংখ্যক তরুণ জেনেছে তারা যে মাটির সন্তান সেখানে স্কুল হয়েছে ১০৯ বছর আগে। লাইব্রেরি হয়েছিল সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীতেই। তারা জেনেছে কোড়কদীর মাটি ছিল অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চার ঘাঁটি।
আর যাঁরা দূর দূরান্ত থেকে এসেছিলেন হয়তো তাঁদেরও প্রাপ্তি ঘটেছে কিছু। কোড়কদী সম্পর্কে ভাসা ভাসা জ্ঞানকে খানিকটা হলেও পূর্ণতা দিতে তাঁরা পেরেছেন। কোড়কদী সমাবেশ আমাদেরকে করেছে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আগ্রহী করেছে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে। শিখিয়েছে বাংলার মানুষ ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লিঙ্গ নির্বিশেষে কেমন সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণ করতে পারে একটি সৎ প্রয়াস সফল করার জন্য।
কোড়কদী সমাবেশের ইতিবৃত্ত সন্ধানে
সুব্রত কুমার দাস
 
--------------------------------
 
বিবেকবার্তা ডট কম


Rating (Votes: )   
    Comments (0)        Tell friend        Print


Other Articles:
'ধোঁয়া বেরোনোর পথ না থাকায় এত মৃত্যু' (27.02.2010)
রাবিতে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অগ্নিসংযোগ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানব বন্ধন (26.02.2010)
বিস্ফোরণের তদন্ত দাবি বিএনপির (24.02.2010)
দৈনিক আমাদের সময় প্রতিনিধি মোল্লা হারুন উর রশীদ এর উপর সন্ত্রাসী হামলা (22.02.2010)
যথাযোগ্য মর্যাদায় রাবিতে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন (22.02.2010)



 
::| Events
September 2010  
Su Mo Tu We Th Fr Sa
      1 2 3 4
5 6 7 8 9 10 11
12 13 14 15 16 17 18
19 20 21 22 23 24 25
26 27 28 29 30