
এক বছর আগের বিদ্রোহের ক্ষতচিহ্ন নিয়েও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে উল্যেখ করে বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম বলেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে এটি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীতে পরিণত হবে। এক বছর আগের রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং হন্তারকদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, অপরাধীরা পার পাবে না। তবে নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তি না পায়, সে দিকেও সজাগ থাকার কথা জানিয়েছেন বিডিআর প্রধান। ত্রাস সৃষ্টি করে কোনো দাবি আদায় করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।গতকাল বুধবার রাইফেলস সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বার্ষিক দরবারে বক্তব্য রাখেন মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম।বেলা ১১টায় দরবার হলের পাশেই বিডিআরের মাল্টিপারপাস ট্রেনিং শেডে এই বিশেষ দরবারের আয়োজন করা হয়। দরবার হলকে বিশেষ আদালত ঘোষণা এবং ৫নং বিশেষ আদালতে বিচার শুরু হওয়ায় বিকল্প হিসেবে দরবারের স্থান পরিবর্তন করা হয়। দরবারে বাংলাদেশ রাইফেলস-এর সর্বস্তরের কর্মকর্তা, জেসিও এবং অন্যান্য পদবির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিডিআর মহাপরিচালক বলেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ক্ষতচিহ্ন আমাদের কাঁধে রয়েই যাবে। এই ঘটনা আমাদেরকে জাতির কাছে ছোট করে দিয়েছে। অনেকেই বিডিআরকে দুর্বল চিত্তের অধিকারী মনে করছে। সীমান্তে অস্থিরতা, এটাও একটা কারণ। তবে বিদ্রোহের এক বছরে ঘুরে দাঁড়াতে পেরে মনে হচ্ছে আমরা দুর্বল নই। আমাদের নতুন শপথ হোক ‘আমরা নতুন, আমরা এক, আমরা বলীয়ান’।
মেজর জেনারেল মইনুল বলেন, সন্ত্রাস এবং ত্রাস সৃষ্টি করে কেউ কখনো দাবি আদায় করতে পারে না। সেদিন সবাই ভুল করেছিল। এতোগুলো মৃত্যুর পরে কোনো দাবি পূরণ হয় না। গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহে নিহত কর্মকর্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান মেজর জেনারেল মইনুল ইসলাম। বিদ্রোহে জড়িতদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করে বিডিআরের ডিজি বলেন, গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারিও একইভাবে দরবার শুরু হয়। নিহত মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ চৌধুরী যখন বক্তব্য দিতে শুরু করেন ঠিক তখনই এক বিদ্রোহী অস্ত্র হাতে নিয়ে মঞ্চে চলে আসে।
এ সময় তার পাশে বসা বর্তমান অতিরিক্ত মহাপরিচালকে দেখিয়ে বলেন, এই একইভাবে বসা ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক নিহত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী। তিনি সেই সৈনিককে পরাস্ত করতে সক্ষম হলেও দরবারে উপস্থিত সৈনিকেরা সেখানে ‘জাগো’ বলে দরবার হল ত্যাগ করে। তারা যদি সেদিন ওভাবে চলে না যেতো, তাহলে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতো না। তাই বিদ্রোহে জড়িতদের চিহ্নিত করতে সাক্ষী দিতে জওয়ান ও তাদের পরিবারের প্রতি আহ্ববান জানান তিনি।ডিজি বলেন, সঠিক সাক্ষীতে অপরাধীরা পার পাবে না। তবে নিরাপরাধ কেউ যেন শাস্তি না পায়, সেদিকেও সজাগ থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদ্রোহের পর অনেক আবাসিক স্থান থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছিল, কিন্তু সে বিষয়ে কেউ সায দিতে আসছে না। যথাযথভাবে সাক্ষ্য পাওয়া গেলে নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তির হাত থেকে বেঁচে যাবে বলেও উল্যেখ করেন তিনি।
বিডিআর বিদ্রোহ গণতান্ত্রিকভাবে ও শান্তির পরিবেশে দমন হয়েছে উল্যেখ করে মহাপরিচালক আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিডিআর সদর দপ্তরে আপনাদের হাজির হতে বলেছিলেন। একবার কি ভেবে দেখেছেন-প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা কতো দূরদর্শী ছিল? কিন্তু সেদিন আপনারা নিজের পোশাক ফেলে দেয়াল টপকে চলে গেলেন। পরে যদি প্রধানমন্ত্রী আপনাদের ফিরে আসার ঘোষণা না দিতেন তাহলে বাংলার জনগণ আপনাদের ওপর ক্ষিপ্ত হতো। তিনি বলেন, এক বছরে বিডিআর বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরেছে। আগামী ১ বছরে পুনর্গঠিত হয়ে সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে। এতে বহু বছরের ঐতিহ্য ফিরে পাবে। মহাপরিচালক বলেন, বিদ্রোহে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করতে বিডিআর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের মূলমন্ত্রের শপথ একটাই, আর তা হচ্ছে আমরা সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী। সীমান্তের সা¤প্রতিক ঘটনায় বিডিআরকে দুর্বল ভাবার কোনো কারণ নেই উল্যেখ করে মইনুল বলেন, বিডিআর সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। বিদ্রোহের পরে এই বাহিনীর অনেক অস্ত্র জব্দ অবস্থায় পড়ে আছে। এটা লজ্জার। এগুলো নষ্ট হতে পারে- এমন আশঙ্কায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন তিনি। বিডিআরে পদোন্নতি এক বছর বন্ধ থাকলেও আবার চালু করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন তিনি। তিনি বলেন, আমাদের একটাই কথা তা হলো শৃঙ্খলা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিডিআরের ভেতরে বসে জুয়া খেলবে, তা হবে না। এমন হলে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে। প্রয়োজনে জেলে পাঠানো হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।তিনি বলেন, বিদ্রোহের পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে বিডিআরের নতুন নাম বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) ইতিমধ্যে নীতিগতভাবে অনুমোদন করেছে সরকার। পরিবর্তন আসছে পোশাকেও। সংস্কারের মধ্য দিয়ে বিডিআর অচিরেই আদর্শ একটি শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে পরিণত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সে জন্য বাহিনীর প্রত্যেক সদস্যকে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্ববান জানান মইনুল। পরে মহাপরিচালক চোরাচালান দমনে বিভিন্ন সাহসিকতাপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০৯ সালে বাংলাদেশ রাইফেলস-এর কর্মকাণ্ডে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচিতদের পুরস্কার বিতরণ করেন। গত বছর ২৫ ফেব্রুয়ারি দরবার হলে একইভাবে বার্ষিক দরবার চলাকালে বিডিআর সদস্যরা বিদ্রোহ করে। ওই বিদ্রোহে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৫ জন নিহত হন।